img

গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো বিমান হামলাকে বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ওই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ১৪টি বোমা ফেলা হয়। এছাড়া অভিযানে সহায়তা করতে বহু যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ও অন্যান্য সহায়ক বিমান অংশ নেয়।

এখন আবার ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তার বক্তব্যের পেছনে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে তেহরানের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষের আন্দোলনের প্রতি সংহতি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তা গত গ্রীষ্মের মতো সীমিত পরিসরের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে হামলা চালাতে হলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি, তাদের সহযোগী বাসিজ বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর কমান্ড সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এ বাহিনীগুলোই মূলত বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, এসব কমান্ড সেন্টারের অনেকগুলোই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। এতে হামলা হলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে উল্টো ফল হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র যাদের সমর্থন করতে চায়, সেই সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি ইরান সরকার এটি প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার বলেন, ‘যা-ই করা হোক, তা অত্যন্ত নির্ভুল হতে হবে। আইআরজিসির বাইরে কোনো বেসামরিক হতাহত হলে পরিস্থিতি উল্টো দিকে যেতে পারে।’

তার মতে, সামান্য ভুলেও বেসামরিক মানুষ নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আর মুক্তিদাতা হিসেবে দেখা হবে না। তখন অনেক সংস্কারপন্থি মানুষও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।

কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হতে পারে

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষক পিটার লেটন বলেন, বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বিভিন্ন ধরনের লক্ষ্যবস্তু রয়েছে।

তার মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বও পরোক্ষভাবে ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তবে আগের হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তিদের লুকিয়ে রাখা ও ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।

শুস্টারের ভাষায়, ‘ইরান জানে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়ালে রাখতে হয়। তবে আমরা দেখিয়েছি, যেটা খুঁজে পাই, সেটায় আঘাত করতে পারি।’

তবুও শাসকগোষ্ঠীর নেতাদের বাসভবন বা দপ্তরে হামলা একটি বার্তা দিতে পারে বলে মনে করেন লেটন। তার মতে, সামরিক দিক থেকে এর গুরুত্ব কম হলেও এটি প্রতীকী পদক্ষেপ হতে পারে।

আরেকটি কৌশল হতে পারে অর্থনৈতিক চাপ। বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসি ও শীর্ষ নেতৃত্বের দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলা চালানো হলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের এক হিসাবে বলা হয়েছে, ইরানের মোট দেশজ উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে আইআরজিসি। এই বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করাই হতে পারে লক্ষ্য।

শুস্টার বলেন, উদ্দেশ্য হতে পারে আইআরজিসির সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত করে তোলা, যেন তারা শাসনব্যবস্থার স্বার্থে ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়।

কোন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

গত বছরের হামলায় বি-২ বোমারু বিমান প্রধান ভূমিকা রাখলেও এবার ভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শুস্টারের মতে, আইআরজিসির আঞ্চলিক সদর দপ্তর ও ঘাঁটিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিন বা যুদ্ধজাহাজ থেকে ইরানের উপকূলের অনেক দূর থেকেই নিক্ষেপ করা সম্ভব, এতে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি কম থাকে।

আরেকটি বিকল্প হলো জ্যাসম নামের দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এতে শক্তিশালী বোমা থাকে এবং এটি বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপ করা যায়।

ড্রোন ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। তবে স্বল্পপাল্লার বোমা ফেলে চালিত বিমানের হামলা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী কাছাকাছি অবস্থানে নেই। ফলে দ্রুত হামলা চালাতে হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটি বা আরও দূরের ঘাঁটি থেকে অভিযান চালাতে হতে পারে।

গত গ্রীষ্মে বি-২ বোমারু বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্য থেকে টানা উড়াল দিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছিল। মাঝপথে আকাশেই জ্বালানি নেওয়া হয়েছিল। একইভাবে অন্যান্য যুদ্ধবিমানও আকাশে জ্বালানি নিয়ে অভিযান চালাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি হঠাৎ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের বড় ধরনের চলাচল বা বি-১ বোমারু ও এফ-১৫ স্ট্রাইক ঈগলের মতো বিমান ইরানের কাছাকাছি ঘাঁটিতে সরানো হয়, তাহলে সেটি আসন্ন হামলার ইঙ্গিত হতে পারে।

সামরিক শক্তির প্রদর্শন

পিটার লেটনের মতে, এবার হামলা হলে তা হবে দৃশ্যমান ও নাটকীয়। তার ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসন এমন অভিযান পছন্দ করে, যা দ্রুত শেষ হয় এবং গণমাধ্যমে বড় প্রভাব ফেলে।

একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে পারস্য উপসাগরের তেল স্থাপনা। এতে ইরানের অর্থনীতি মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়বে।

সব মিলিয়ে, ইরানে নতুন কোনো হামলা হলে তা সীমিত সময়ের হলেও এর প্রভাব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ